বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২

রোন্‌-আল্পের ডায়েরীঃ পর্ব-২


“Le Valencey”- রুম নম্বর 103B. স্মোক ডিটেক্টরের তীব্র শব্দে ছুটতে ছুটতে এসে জানালা খুলে দিলাম, এদিকে জানালা খুলে শাটার তুলতে তুলতে কুকিং প্যানে ছেড়ে আসা পেঁয়াজ প্রায় পুড়েই গেলো বলে। এ এক অদ্ভুদ সমস্যা- রান্নার ধোঁয়া একটু বাড়লেই স্মোক ডিটেক্টরের এলার্ম বাজতে শুরু করে। প্রথম দিন তো বিরক্ত হয়ে ডিটেক্টর এর ব্যাটারি খুলে ফেলেছিলাম, পরবর্তীতে ম্যানেজার এসে আবার লাগিয়ে দিলেন আর বলে গেলেন এটা যাতে আর না খুলি। এরপর থেকে আঁচ কমিয়ে রান্না আর ধোঁয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে জানলা খোলার চেষ্টা করার এক অদ্ভুদ সাম্যাবস্থা বজায় রেখে যাচ্ছি। দুপুরের দিকে ব্যাংকের ম্যানেজার রাফায়েল সাহেবের এপয়ন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিলাম, এই এলার্মকান্ড নিয়ে দেরি হয়ে যাওয়ায় আবার বিকাল চারটায় এপয়ন্টমেন্ট শিফট করলাম। খিচুড়ি আর ডিম ভাজা দিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করে বেরিয়ে পড়োলাম ব্যাংকের উদ্দেশ্যে। 

Guilherand-Granges, রোন্‌ নদীর অপর তীরে পাহাড়ের ঘেরা এলাকা। ব্রিজ পার হয়ে গুগল ম্যাপ লোকেশন দেখে দেখে সাদি কার্নো এভিনিউতে এসে থামলাম। রাস্তার মোড়ের বাস স্টপেজে বড় বড় করে লিখা “Ave Sadi Carnot”, কার্নো ইঞ্জিনের আবিষ্কারক ফ্রেঞ্চ সাইন্টিস্ট সাদি কার্নোর কথা মনে পড়ে গেলো। আরেকটু সামনে এগিয়ে ব্যাংকের সামনে গিয়ে ভেতরে ঢুকে ভিডিও ডোরবেল এর বাটন প্রেস করলাম। কিছুক্ষণ পর একজন তরুণী এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিলেন, রাফায়েল এর সাথে এপয়ন্টমেন্ট ছিল বলার পর বসতে বললেন। এই ব্যাংকে একমাত্র রাফায়েলই ইংরেজিতে কথোপকথন করে, বাকিদের সবাইকে ইংরেজিতে কিছু জানতে চাওয়া আর না চাওয়া সমান। রাফায়েল এর সাথে কথোপকথন শেষ করে কিছু কাগজপত্রে সাইন করে ব্যাংক একাউন্ট ওপেন করে ফেললাম। ইউনিভার্সিটির সাথে ব্যাংকের পার্টনারশিপের অংশ হিসেবে ৮০ ইউরো পেলাম উলটো। ম্যানেজার বললেন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব মেইলবক্সে পৌঁছে যাবে। সে থেকে শুরু নিয়মিত Le Valencey-এর গ্রাউন্ড ফ্লোরের আমার নামের মেইলবক্স চেক করা। প্রতিদিন ইমেইল চেক করার মতো এও এক নতুন অভ্যাস যুক্ত হলো, প্রতিদিন আসতে যেতে মেইলবক্স খুলি আর দেখি কোন চিঠি/ডকুমেন্ট এসেছে কিনা!

ব্যাংক একাউন্ট খুলে ফেলার পর বাকি আছে ভিসা ভ্যালিডেশন, সোশাল সিকিউরিটি, ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্রেশন আর কাফ। আসার পর এই কাজগুলোর টেনশনে ঠিকমতো ঘুমই হচ্ছেনা। তার উপর গ্রোসারি কিনতে সুপারমার্কেট এ গেলেই দুচোখে অন্ধকার। গুগল লেন্স ব্যাবহার করে করে প্রত্যেকটা জিনিস ট্রান্সলেট করে নিতে হচ্ছে। চালকে বলে খ্রি,মুরগিকে এরা বলে পোলে, দুধকে এরা বলে ল’লে, ডিমকে ওউফ, আর পাউরুটিকে পাঅ্যাঁ। প্রত্যেকটা জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন নাম, এদের এলফাবেটগুলা ইংরেজির মতো হলেও উচ্চারনে প্রচুর ভিন্নতা। কোন শব্দই এরা পুরোপুরি উচ্চারণ করেনা, তার মধ্যে শব্দের শেষের একটা-দুটা এলফাবেট তো টোটালি বলেনা। এই যেমন দুধকে Le Lait লিখলেও উচ্চারণ করা হয় ল’লে। মাথায় আসেনা, উচ্চারণই যখন করবিনা, লিখতে বলছে কে তোদের। প্রত্যেকটা শব্দের সাথে Le আর La আছে। Le  ম্যাসকিউলিন আর La ফেমিনিন। প্রত্যেকটা জিনিস নেয়ার আগে দামটা বারবার বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট হয়ে যাচ্ছিল। চাল এক কেজির প্যাকেট ২.১৩ ইউরো, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২১৩ টাকা। পাউরুটির প্যাকেট ১ ইউরো মানে একশত টাকা! আহা, প্রথম প্রথম খরচ করতে কষ্ট হচ্ছিল, আর তাই নিতান্তই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলই নিচ্ছিলাম। বাসায় ফিরে রান্নাবান্না শেষ করে অনলাইনে ৫০ ইউরো পেমেন্ট করে ভিসা ভ্যালিডেট করে নিলাম, যাক একটা টাস্ক গেল। 

সকাল ৮.১৫ এর ক্লাস। আর তাই সকাল সকাল উঠে দুধ-পাউরুটি আর জেলি দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। সেই বছর তিনেক আগে শেষ সকাল সকাল ক্লাস করতে গিয়েছিলাম। কোর্সের নাম  Architecture of Microprocessor. প্রফেসর সিস্টেম অন চিপ নিয়ে বিস্তর লেকচার দিচ্ছিলেন, আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। এমবেডেট সিস্টেম এ গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে আছে VHDL আর FPGA যা হালকা পড়াশোনা করে আসলেও লেকচার শুনে মনে হচ্ছে আরো বেশি পরিশ্রম করতে হবে এসব নিয়ে। ক্লাসের মাঝে ব্রেকে বাকিদের সাথে আলাপ করছিলাম। লোকাল স্টুডেন্ট্রা ফ্রেঞ্চ এ কথা বললেও আমাদের তো ইংরেজি ছাড়া কোন উপায় নেই। যদিও পাকিস্তানি ক্লাসমেট হাসানের সাথে টুকটাক হিন্দি-উর্দু মিশিয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কথা বলতে বলতে স্টুডেন্ট কমন রুমে গিয়ে দেখতে পেলাম বেশ কিছু ভেন্ডিং মেশিন। কফির জন্যে একটা, ড্রিংস এর জন্যে একটা আর অন্যান্য ফুড আইটেম এর একটা। আমি আর করিম মিলে কফির ভেন্ডিং মেশিনের সামনে গেলাম। এক কাপ কফি পঞ্চাশ সেন্ট, মানে বাংলাদেশি পঞ্চাশ টাকা। কি আছে জীবনে ভেবে পকেট থেকে পঞ্চাশ সেন্টের একটা কয়েন বের করে ফেলে দিলাম। এক চুমুক দিতেই…ওয়াক! কি তেঁতো স্বাধ। এই কফির দাম পঞ্চাশ টাকা। এর চেয়ে আমার টঙের সাত টাকার চা ঢের ভালো। 

সবেমাত্র ক্লাস শুরু হতে না হতেই ইনোভেশন প্রজেক্ট এর সিলেকশন এর জন্য নোটিশ দিয়ে দেয়া হলো। যেহেতু এক বছরের মাস্টার্স, একটা ইনোভেশন প্রজেক্ট করতে হবে। কোর্স টিচার প্রফেসর ইউনেলা প্রধান মাস্টার্সের সকল ছাত্রছাত্রীদের হলরুমে ডাকলেন। এরপর প্রায় ১০-১২ টার মতো প্রজেক্টের লিস্ট দেখিয়ে বললেন, প্রতিটা প্রজেক্টে সর্বোচ্চ চারজন এন্ট্রি করা যাবে। প্রত্যেকে যাতে এই সপ্তাহের মধ্যে নিজেদের চয়েজ প্রায়োরিটি গুগল ফর্মের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়। একেকটা একেক ফিল্ডের প্রজেক্ট, এমবেডেড, আইওটি, সাইবার সিকিউরিটি, হার্ডওয়্যার সিকিউরিটি, কন্ট্রোল সিস্টেম, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, টেলিকমিউনিকেশন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রজেক্ট। এর মধ্যে কিছু প্রজেক্ট সরাসরি বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে ইউনিভার্সিটির কাছে প্রপোজাল দেয়া হয়েছে, আর কিছু প্রজেক্ট ইউনিভার্সিটির LCIS ল্যাবের চলমান বা সাম্ভাব্য প্রজেক্ট। হাসান প্রত্যেক শিক্ষক আর ছাত্রছাত্রীদের মতামত নেয়া শুরু করে দিল, ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট করলে ভালো হবে না ল্যাব এর প্রপোজ করা প্রজেক্ট করলে ভালো হবে। প্রথম দিন থেকেই এই পাকিস্তানি হাসান ছেলেটাকে কেন জানি আমার “থ্রি ইডিয়টস” মুভির চাতুরের মতো মনে হচ্ছিল, প্রত্যেকটা বিষয়ে তার এতো বেশি আগ্রহ আর জ্ঞানী ভাব! আমার চিন্তাভাবনাকে প্রমাণ করতেই বুঝি হঠাৎ করে আমাকে হাসান প্রশ্ন করে বসে-

-জেন্টেলম্যান, দাশ সাল বাদ আপ খোদ কো কাহা পে দেখনা চাহতা হু? 

-Man, I am now thinking only for ten minutes to finish the class and go home. বাকি সাব বাদ মে দেখা যায়েগা। 

কি ইংরেজি-উর্দু-হিন্দি যা মুখে আসছে বলে যাচ্ছি। শুধু ফ্রেঞ্চটা আসছে না মুখ দিয়ে, বোম মারলেও বের হবেনা এমন মনে হচ্ছে। বিকেলের ফ্রেঞ্চ ল্যাংগুয়েজ ক্লাসে ম্যাম আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কথোপকথন ফ্রেঞ্চ এ চালাতে। আর আমরা বারবার ইংরেজি বলছিলাম, বিষয়টা অনেকটা এমন- ফ্রেঞ্চ এ কথা বলে আর ইশারায় কিংবা ইংরেজিতে এক্সপ্লেইন করে বোঝানোর চেষ্টা করা। বর্নমালা আ, বে, তে, সে… পড়িয়ে সংখ্যার একটা শিট ধরিয়ে দিলেন ম্যাম। উন, দো, তোয়া, খাতর, সাংক, সিস, সেপ্ট,হুইট, নাফ, ডিক্স ……… এইগুলা নাকি ১ থেকে ১০। মনে হচ্ছিল এই বয়য়ে আবার কিন্টারগার্টেন এ ভর্তি হয়েছি আর মিস নতুন করে সব পড়াচ্ছেন!  

উইকএন্ডে অনিক ভাই তার বাসায় দাওয়াত দিলেন। এইতো সেদিন উনি আমাকে উনার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আর আমি এড্রেসই ভুলে গেছি। ৯৮, ভিক্টর হুগো…গুগলে সার্চ দিয়ে চলে গেলাম বাসার সামনে। গিয়ে দেখি অনিক ভাই রান্নাবান্না করে অপেক্ষা করছেন আমার জন্যে। বাঙালি ভাইয়েরা মিলে বেশ ক্ষানিক্ষণ আড্ডা দেয়া গেলো। ডিনারে ছিল অনিক ভাইয়ের স্পেশাল বিফ কাচ্চি, অনিক ভাই যে এতো ভালো শেফ তা উনার রান্না টেস্ট না করলে জানাই হতো না।  

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

রোন্‌-আল্পের ডায়েরীঃ পর্ব-২

“Le Valencey”- রুম নম্বর 103B. স্মোক ডিটেক্টরের তীব্র শব্দে ছুটতে ছুটতে এসে জানালা খুলে দিলাম, এদিকে জানালা খুলে শাটার তুলতে তুলতে কুকিং প্য...