শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

রোন্‌-আল্পের ডায়েরীঃ পর্ব-১

“ভোস- না লায়ে ভেলন্স ভিলে” - TGV ট্রেনের এনাউন্সমেন্টে এই কথাটা শোনার পরপরই ৩৫-৩৭ কেজি ওজনের একগাদা তল্পি-তল্পা নিয়ে ট্রেন থেকে নামলাম। সেই থেকে শুরু করে পরিচিত ফ্রেঞ্চ শব্দগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে ভাল বুঝি। যদিও বোওজোর, স্যালুট, জো ম্যাপেলে, জো ভোদগে, মাখছি বোকুর মত কিছু স্টার্টার প্যাকেজ শিখে আসছিলাম- আর এসে দেখি এ-তো পুরাই সমুদ্র। ফ্রান্সের “গেইট অব সাউথ” খ্যাত এই ভ্যালন্স নগরীর প্রাণকেন্দ্রে বসে পড়ন্ত বিকেলের যে সময়টাতে এই ডায়েরীর প্রারম্ভিকা লিখছি, ঠিক সেই সময়টাতে প্রায় পাঁচ হাজার মাইল দূরের লাল-সবুজের দেশটিতে এখন রাত নেমেছে। এই রোন্‌-আল্প অঞ্চলটা সত্যিই চোখ জুড়ানো আর মনমুগ্ধকর। সুইস আল্পসের Rhône গ্লেসিয়ার থেকে উৎপন্ন হয়ে ফ্রান্সের দক্ষিন-পূর্ব দিকে বয়ে চলেছে ইউরোপের অন্যতম দীর্ঘ নদী রোন্‌। লিয়ন, গ্রেনোবল, ভ্যালন্স, এভিগনসহ বহু ছোট-বড় শহরকে সমৃদ্ধ করে রোন্‌ ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে ইউরোপকে। পূর্বের সুউচ্চ পর্বতসারী আর এই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠা পাহাড় আর সবুজে বেষ্টিত এই অঞ্চলকে রোন্‌-আল্প নামে ডাকা হয়।

এইতো গত সপ্তাহেই কাতার এয়ারের A330-200 এয়ারবাসটিতে করে যখন নিজ স্বদেশ ছেড়ে আসছিলাম, তখন ঢাকা বিমানবন্দর যেন সাঁঝবাতি জ্বালিয়ে বিদায়ের আবহ সৃষ্টি করেছিল। বিকেলের এক পশলা ঝুম বৃষ্টিও যেন সেই আবহকে আরও কিছুটা বিষাদময় করে তোলে। ছোটভাই সাকিব ও তার বন্ধু টিপু এসেছিল বিদায় জানাতে, তিনজনের সবারই এয়ারপোর্টে নতুন অভিজ্ঞতা। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর গ্রেনোবল ইউনিভার্সিটির অর্নব ভাই টার্মিনালে এসে পৌঁছাতেই কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, দুজনেরই সেইম ফ্লাইট। আনাড়ির মত এদিক ওদিক ঘুরতে হবেনা আর। ছোটভাইকে বিদায় দিয়ে চেকইন এর জন্যে যখন প্রবেশ করছিলাম মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন উদাস হয়ে গেলাম। পরিবারের বাকিরা এলে যে কি অবস্থা হতো আল্লাহই ভালো জানেন। চেকইন ঠিকঠাকভাবে হয়ে গেলে ইমিগ্রেশনের জন্য পা বাড়ালাম। ই-পাসপোর্স্ট দেখে সামনে থাকা একজন পুলিশ ই-গেইটে পাসপোর্ট স্ক্যান করিয়ে সামনে যেতে বলল। বাহ, ভালই তো ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়েছে দেখছি! মুহূর্তেই আমার ছবি ধারণ করে সামনে থাকা গেইট খুলে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সামনে যেতে চাইলে সেই পুলিশ ভাই বললেন, আবার লাইনে গিয়ে দাঁড়ান। মানে, পুরাই ঘোল খাওয়ানো যাকে বলে আরকি। এভাবে যারা আসছিল প্রত্যেককে ই-গেইট দিয়ে প্রবেশ করিয়ে আবার লাইনে দাড় করিয়ে দেয়া হচ্ছিল। ওই সময় নিজেদেরকে কেমন গিনিপিগ গিনিপিগ মনে হচ্ছিল। ই-গেইটের কাউন্টারে যদি ইমিগ্রেশন অফিসার না-ই বা থাকবে, তবে এই লোক দেখানো ই-গেইটের দরকারই বা কি ছিলো?

সন্ধ্যা ৬.৪৫, সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, ফ্লাইটের সময়ও প্রায় কাছাকাছি। আর এদিকে ইমিগ্রেশন অফিসার আপন মনে হেলেদুলে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সামনে থাকা অর্নব ভাইয়ের পাসপোর্ট চেক করার সময় মধ্যবয়স্ক অফিসার বললেনঃ

- কই যাবেন?

- ফ্রান্স

- স্টুডেন্ট?

- ভিসা চেক করাই আসেন যান

এরপর দুজনেই লাইন ছেড়ে গেলাম ভিসা চেকিং ডেক্সে। বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে আরেকজন অফিসার আসলেন আর ছোট একটা ক্যামেরা টাইপ মেশিন দিয়ে ভিসা চেক করে করে ভিসা ভেরিফাইড লিখে দিলেন। এরপর আবার ওই ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে আসলাম। অর্নব ভাইয়ের পাসপোর্ট আর ভিসা দেখে অফিসার বললেনঃ

- ভার্সিটির এডমিশন লেটার বাইর করেন।

- এই যে এডমিশন লেটার।

- এইটা কি এডমিশন লেটার? এডমিশন লেটার চিনেন?- ধমকের সুরে বললেন অফিসার।

- এইটা অফার লেটার, এডমিশন রেজিস্ট্রেশন যাবার পর হবে।

- কোত্থেকে পাশ করছেন? দেখি সার্টিফিকেট দেখান।

- ইন্ডিয়া, শিমলা ইউনিভার্সিটি। এই যে সার্টিফিকেট।

মিনিট বিশেক কাগজপত্তর ঘাটাঘাটি করে অবশেষে অর্নব ভাইকে অফিসার ডিপারচার সিল দিলেন। এরপর আমার পালা…

- আপনিও কি ইন্ডিয়ায় পড়ছেন নাকি?

- নাহ, চট্রগ্রাম। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি। এই যে সার্টিফিকেট আর অফার লেটার।

- হুমম, বাড়ি কই?

- চট্রগ্রাম।

- কোন থানা?

- পতেঙ্গা।

- পতেঙ্গার কই?

- পতেঙ্গার আবার কই? সবই তো পাসপোর্টে লিখা আছে।

- পাসপোর্টে ত লিখা আছেই। তাই বলে বলবেন না নাকি?

এরপর পটপট করে বাড়ির নাম, গ্রামের নাম, ওয়ার্ড নম্বর বলে গেলাম- ছোটবেলায় স্কুলে স্যারকে পড়া দেয়ার কথা মনে পড়ে গেলো। এরপর ফাইলপত্তর আরো কিছুক্ষণ ঘেঁটে ঘুটে অফিসার ডিপারচার সিল মেরে দিলেন। তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে পাঁচ নাম্বার গেইট খুজে বের করলাম বিমানে উঠার জন্যে। এখানেও লাগেজ চেকিং শেষে আল্লাহর নাম নিয়ে উঠলাম বিমানে।

সিট খুজে বের করে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এই সেই চিরাচরিত সিস্টেম, যা কিনা সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও যাবার প্রাক্কালেও একেবারে নাকেমুখে করে ছাড়ল। অবশ্য বিগত কয়েক বছর ধরে যে পরিমাণ ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছি তার কাছে ইহা নস্যিমাত্র। গ্রাজুয়েশন এর পর দেশেই কিছু করার পরিকল্পনা থাকলেও দিনকে দিন সেই পরিকল্পনাকে তলিয়ে যেতে দেখেছি। প্রায় তিনটে বছর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও নিজের মেধা ও যোগ্যতার একরকম সঠিক মূল্যায়ন পাইনি বলা চলে। গত বছর থেকে বাইরে পড়তে আসার তোড়জোড় শুরু করেছিলাম, জিআরই, আইএলটিএস একের পর এক এক্সামে বসা, প্রফেসরদের মেইল করা এভাবেই চলছিল জীবন। তিন-চারটা আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে এডমিশন হলেও স্টিপেন্ড তেমন আহামরি কিছু ছিলনা। এদিকে গ্রেনোবল ইন্সটিউট অব টেকনোলজি থেকে এমবেডেড সিস্টেম নিয়ে মাস্টার্স এর অফার লেটার পাই এই বছরের মে মাসে, জুনের দিকে আসে স্কলারশিপ ডিসিশন। এক বছরের মাস্টার্স প্রোগ্রামে প্রথম ছয় মাসের জন্য স্টিপেন্ড ও পরবর্তী ছয় মাসের জন্য একখানা পেইড ইন্টার্নশিপ মিলেছে। মোটামুটি খেয়েপড়ে চলে যাবে ভালোই, কিন্তু চিন্তা হচ্ছিল প্রাথমিক খরচাপাতি আর পরিবারকে নিয়ে। দুশ্চিন্তাময় মুহূর্তে খালাদের সার্বিক সহযোগিতায় সবকিছু মোটামুটি সহজ হয়ে যায়। একদিকে এসব ভেবে যতটা না সন্তুষ্ট ছিলাম, অন্যদিকে মন খারাপ ছিল ফেলে আসা ঘর ও ঘরের মানুষদের জন্যে। আর নিজেকে নিজেই স্বান্তনা দিচ্ছিলাম টনি মরিসনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্বরণ করে-

“If you want to fly, you have to give up the things that weigh you down”

পাশের যাত্রীটি পরিবারের লোকজনের ফোন দিয়ে দিয়ে বিদায় জানাচ্ছিলেন। সিম যেহেতু আর কাজে আসবেনা তাই আমি সিম রেখে এসেছি, আর এখন বাড়িতে একটা ফোনও দিতে পারছিনা। শেষমেশ সহযাত্রী ভাইটির কাছে ফোন চেয়ে নিলাম আম্মু-আব্বুর সাথে একটা বার কথা বলে নিতে। কথা শেষ করার খানিক বাদেই নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলো আর বিমান দোহার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ ছোট হয়ে আসছিল, উপর থেকে দেখার চেষ্টা করেও অন্ধকারে তেমন একটা অনুভব করতে পারলাম না। পুরো ফ্লাইটে ল্যান্ডিং এর সময় এলটিচিউড দ্রুত কমার কারনে হালকা মাথাব্যাথা ছাড়া আর কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি তেমন। প্রায় পাঁচ ঘন্টার যাত্রা শেষে ফ্লাইট QR-635 কাতারের দোহা এয়ারপোর্টে অবতরণ করল। প্রায় তিনঘন্টার মতো ট্রানজিট শেষে কাতার এয়ারের QR-41 ফ্লাইটে প্যারিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।

ভূমধ্যসাগরের উপর দিয়ে উড়ে চলার সময় ভোরের হালকা আলো ফুটতে শুরু করেছে, আর সেই সাথে মেঘের খেলা। সুবহানাল্লাহ, উপর থেকে আল্লাহর সৃষ্টি কতই না সুন্দর - যতই দেখছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। ফ্লাইট QR-41 যখন প্যারিসের মাটি স্পর্শ করছিল তখন সকাল ৭.২৫। এখানের ইমিগ্রেশন পাসপোর্ট দেখেই সাথে সাথে এরাইভাল সিল দিয়ে দিল। দু-মিনিটেই ইমিগ্রেশন শেষ, ফ্রেঞ্চ নাগরিকদের জন্যে দেখলাম আলাদা ই-গেইট আছে এবং তা পুরোপুরি কার্যকর। ঠিক ঢাকার বিপরীত চিত্র- আমরা উন্নত দেশ থেকে দেখে ই-গেইট বসাতে পেরেছি, কিন্তু সিস্টেম সংস্কার করতে পারিনি। আর এদিকে সকাল সকাল প্যারিস নেমে তো মনে হচ্ছিল কোন এক বিচিত্র রাজ্যে এসে পড়েছি, দুনিয়ার সব মানুষে একাকার এই প্যারিস চার্লস ডি গাউলে এয়ারপোর্ট। লাগেজ কালেক্ট করে প্যারিসে ঘন্টাতিনেক অপেক্ষা করে ভেলন্সের ট্রেইন ধরলাম। ভেলন্স স্টেশনে যখন এসে পৌঁছাই তখন প্রায় বিকেল। অপেক্ষা করতে করতে অনেক্ষণ পর অনিক ভাইয়ের দেখা পেলাম আর পথিমধ্যে আরো কিছু বাংলাদেশি ভাইদের সাথে দেখা হয়ে গেল। এপার্টমেন্টে উঠা থেকে শুরু করে বাজার করা, বাসে চড়া, আশপাশের রাস্তাঘাট সবকিছুতে অনিক ভাই ছায়ার মতো সাথে ছিলেন। এমনকি রাতে এক বাঙালি রেস্টুরেন্ট এ জম্পেশ খাওয়াদাওয়া করালেন। প্রায় ১৩-১৪ ঘন্টা ভ্রমণের ধকল শেষে বাসায় এসে ক্লান্তিতে চোখ জুড়িয়ে আসছিল, পরিবারের সবার সাথে যোগাযোগ করে নিলাম আর সহি-সালামতে পৌঁছানোর খবর জানালাম।

 

ভ্রমনক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই একদিন পর পরিচিতিমূলক ক্লাস শুরু হলো। ক্যাম্পাসের সামনে পৌঁছেই আবিষ্কার করলাম একজন ছাত্র সেলফি নিচ্ছে, দেখতে আমাদের উপমহাদেশেরই মনে হলো। পরে এগিয়ে গিয়ে কথা বলে জানতে পারলাম - পাকিস্তানি স্টুডেন্ট, নাম হাসান। এরপর আমি আর হাসান মিলে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার্স প্রোগ্রামের পরিচিতিমূলক ক্লাসে প্রবেশ করলাম। ঘন্টাখানিকের লেকচারে মোটামুটি একটা ধারনা দিয়ে দিলেন প্রফেসর। লেবানন, মিসর, মরক্কো, স্পেন, বেলজিয়াম, ইরান, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়ার মতো দেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসেছে। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে প্রফেসর ২০১৮ তে এই প্রোগ্রামে আসা কুয়েটের দিপাল হালদার ভাইয়ের কথা স্বরণ করলেন। যদিও ভাই বর্তমানে আমেরিকায় পিএইচডি করছেন, এখানে আসার আগে সব রকম দিকনির্দেশনা উনার কাছ থেকেই নিয়ে এসেছিলাম। সবার সাথে পরিচিতি পর্ব শেষে প্রফেসর ক্যাম্পাস ও সকল ল্যাব ঘুরে দেখালেন। এরপর সকলে একসাথে মধ্যাহ্নভোজন শেষে সিটি ট্যুরে বেরোলাম। স্থানীয় ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্ট এর একজন প্রতিনিধি মধ্যযুগের বিভিন্ন স্থাপনা, শিল্পকর্ম, ফ্রান্সের সুপ্রাচীন প্রাচীর, উপাসনালয়, নেপোলিয়ানের আবাসস্থল আর প্রাচীন সুসজ্জিত মেয়র ভবন ঘুরিয়ে দেখালেন। আশপাশটায় দেখে ফেরার পথে লোকাল বাসের কার্ড করে নিলাম। বাসগুলো শতভাগ ইলেকট্রিক, মানে একটা শহরকে ক্লিন এন্ড গ্রিন রাখার জন্যে যা যা করা দরকার তার সবটাই করছে এই ইউরোপীয়ানরা। আর বাসের ড্রাইভারতো উঠার সাথে সাথেই “বোওজোর” বলে সম্ভোধন করছিল, মানে এতোটা ভদ্র ব্যাবহার কেন এদের? আচ্ছা, এখানে বাসে কোন হেলপার নাই কেন?-আপন মনে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলাম। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামছে আর সুশৃঙ্খলভাবে যাত্রীরা উঠছে। নতুন সংস্কৃতিতে এসে ইহাকেই বোধহয় বলে কালচারাল শক! 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

রোন্‌-আল্পের ডায়েরীঃ পর্ব-২

“Le Valencey”- রুম নম্বর 103B. স্মোক ডিটেক্টরের তীব্র শব্দে ছুটতে ছুটতে এসে জানালা খুলে দিলাম, এদিকে জানালা খুলে শাটার তুলতে তুলতে কুকিং প্য...